চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার সংঘর্ষ হয়েছে। এবার সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবির। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীসহ উভয় পক্ষের ১৬ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ চলাকালে পাথর নিক্ষেপ ও উভয় পক্ষের মধ্যে ফাঁকা গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার বিকেল এ ঘটনা ঘটে। এদিকে ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল ও এএফ রহমান হলের অফিস কক্ষসহ আবাসিক শিক্ষার্থীদের কক্ষগুলোতে ভাঙচুর করেছে।
এসময় লুটপাট হয়েছে বলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান ও আলাওল হল থেকে সরে গেছে শিবির কর্মীরা। সন্ধ্যার দিকে হল দুটার সামনে থেকে ছাত্রলীগের কিছু নেতা–কর্মী চলে এলেও অনেককেই হলের সামনে অবস্থান করতে দেখা গেছে। ক্যাম্পাসে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
ঘটনার সূত্রপাত : দুপুর তিনটার দিকে চবি ছাত্রলীগের বগিভিত্তিক গ্রুপ সিএফসির কিছু কর্মী ছাত্রশিবির নিয়ন্ত্রিত আলাওল হলের মাঠে ক্রিকেট খেলতে যায়। খেলার এক পর্যায়ে দুজন কর্মী হলের ভেতরে ১১৯ নম্বর রুমের আবাসিক ছাত্র মিজানুর রহমানের কাছে একটি খাতা চায়। এ নিয়ে তার সাথে দুই ছাত্রলীগ কর্মীর কথা কাটাকাটি হয়। বিষয়টি বুঝতে পেরে ছাত্রলীগের অন্য কর্মীরা খেলার মাঠ থেকে হলের ভেতরে আসে। অপরদিকে বাকবিতণ্ডা শুনে ঘটনাস্থলে আসে শিবিরের কর্মীরা। এসময় দুই দলের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
আলাওল হলে হামলা : হাতাহাতির বিষয়টি জানাজানি হলে ছাত্রলীগের সিএফসির কর্মীরা একত্রিত হয়ে আলাওল হলে হামলা চালায়। হলের সামনে এসে ছাত্রলীগ কর্মীরা ১০–১১ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীরা। হামলার সময় ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীদের হাতে রামদা, কিরিচ, চাপাতি,রড, পাইপসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দেখা গেছে। এসময় হলের ভেতর অবস্থানরত ছাত্রশিবিরের কর্মীরা পালিয়ে যাওয়ায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। ছাত্রলীগের কর্মীরা হলের ভেতর ঢুকে শতাধিক কক্ষে ভাঙচুর চালায়। ভাঙচুর চলাকালীন ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলায় বেশ কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থী আহত হয়। পরে তাদের পুলিশের হেফাজতে হল থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় ছাত্রলীগ কর্মীরা কয়েকজন সাংবাদিকের কক্ষসহ প্রায় ৪০–৪৫টি কক্ষ থেকে ল্যাপটপ, মোবাইল, ক্যামেরাসহ বিভিন্ন জিনিস লুটপাট করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর পরপরই সিএফসির সাথে ছাত্রলীগের কয়েকটি গ্রুপ যোগ দেয়।
এ এফ রহমান হলে হামলা : আলাওল হলে ভাঙচুর করার পরপরই ছাত্রলীগ কর্মীরা হামলা চালায় পার্শ্ববর্তী এ এফ রহমান হলে। এক্ষেত্রে ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা পূর্ব থেকেই হল ত্যাগ করায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। হলে ঢুকে হল প্রভোস্ট, অফিস কক্ষসহ প্রায় শতাধিক কক্ষে ভাঙচুর করে। এসময়ও হলের ৩০–৪০টি কক্ষ থেকে ল্যাপটপ, মোবাইল, ক্যামেরাসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রিক্যাল পণ্য লুটপাট করে বলে কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করে।
নিজেদের মধ্যে মারামারি : হলের ভাঙচুর শেষে ছাত্রলীগ কর্মীরা অবস্থান নেয় এ এফ রহমান হলের সামনে। এসময় হলের গেটে পুলিশ অবস্থান করতে দেখা গেছে। হলের সামনে অবস্থানকালে ছাত্রলীগ কর্মীদের মধ্যে একে অপরকে শিবির আখ্যায়িত করে মারধর করতে দেখা যায়। এসময় প্রায় ৪–৫ বার নিজেদের মধ্যে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা। এ সকল ঘটনায় অন্তত ৫জনকে চবি মেডিকেল সেন্টার থেকে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।
এদিকে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় ১৬ জন আহতের খবর পাওয়া গেছে। আহতরা হলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ২০০৯–১০ সেশনের রেজাউল ইসলাম, ইসলামের ইতিহাস ২০১২–১৩ সেশনের এস এম মাসুম খান, দর্শন ২০০৯–১০ সেশনের জেমস, হাসান, হিমু, লোকপ্রশাসন বিভাগের মির্জা, মো. মিজান ও মো.জমির, সাংবাদিকতা বিভাগের রায়হান বকুল, ইতিহাস বিভাগের সাইফুল ইসলাম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাইফুল ইসলাম ও মোকতার খান,ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মো. রুকন, সমীর চন্দ্র দাশ, তাসিম হোসেন ও মইন খান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. জহির আহমদ বলেন, ১৬ জন শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ১২ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জনের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন মির্জা, বকুল, সাইফুল ইসলাম,মোকতার খান, তাসিম হোসেন ও মইন খান।
এদিকে সামনে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা। কমিটি গঠনকে সামনে রেখে আলোচনায় আসার জন্য এ সংঘর্ষ বলে ছাত্রলীগের একাধিক সূত্রে জানা গেছে। তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন চবি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মামুনুল হক। তিনি বলেন, ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার জন্য এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ভাঙচুর ও লুটপাটের বিষয়ে তিনি বলেন,এগুলো ছাত্রশিবিরের কর্মীরা করেছে।
ঘটনা প্রসঙ্গে চবি ছাত্রলীগের সাবেক সহ–সভাপতি অমিত কুমার বসু, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সুমন মামুন ও দিয়াজ ইরফান চৌধুরী বলেন, আমাদের কয়েকজন কর্মী আলাওল হলের মাঠে খেলতে গেলে শিবির কর্র্মীরা তাদের বাধা দেয় ও মারধর করে। এসময় তারা ক্যাম্পাসের পরিবেশ অস্থিতিশীল করতে চাইলে আমাদের কর্মীরা তাদের এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মী জানিয়েছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই চবি ছাত্রলীগের নতুন কমিটি আসছে। ফলে ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি, সহ–সভাপতি, যুগ্ম সম্পাদকসহ বেশ কয়েকজন নেতা বিষয়টি নিয়ে তোড়জোড় শুরু করেছেন। এরই অংশ হিসেবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
তবে তা অস্বীকার করে মামুনুল হক বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সত্য নয়, আমরা মৌলবাদের বিরুদ্ধে রাজনীতি করি। মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমাদের চলমান আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে একটি মহল এগুলো প্রচার করছে।
ঘটনা প্রসঙ্গে হাটহাজারী সার্কেলের এএসপি আ ফ ম নিজাম বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। এছাড়া ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রাত ৮টার দিকে চবি প্রক্টর সিরাজ উদ দৌল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হল কর্তৃপক্ষের সাথে বসে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আলাওল ও এ এফ রহমান হল থেকে শিক্ষার্থীদের বের হয়ে যেতে দেখা গেছে। হল দুটির সামনে অবস্থান করছে পুলিশ।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন